শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে নতুন ষড়যন্ত্র

একটা মানুষ এত জনপ্রিয় হয় কী করে! তাঁর কিছুই করা যাচ্ছে না। তাই এবার নতুন ধান্দায় নেমেছেন উনারা। কোন ওষুধেই যখন কাজ হচ্ছে না, তখন একটু কড়া ডোজের কোরামাইন দেয়ার ক্ষেত্র প্রস্তুত করা দরকার। অবশেষে তারই সূচনা করেছেন গত ২৭ ফেব্রুয়ারি বিকেল ০৪ টা ১৮ মিনিটে দেশের বহুল প্রচারিত এক দৈনিকের যুগ্ম সম্পাদক মিজানুর রহমান খান।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের যখন বলেছেন যে, ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে’ পাপিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তখনই খান সাহেব সম্ভবত এই লেখার জন্য আদিষ্ট হয়েছেন। তিনি লিখতে গিয়ে বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৫ অনুচ্ছেদ, ওয়ারেন্ট অফ প্রিসিডেন্স ছাড়াও নানা যুক্তি, গল্প, অনুমান নির্ভর কল্পকাহিনীর একটা চমৎকার ‘রসালো’ নিবন্ধ লেখার চেষ্টা করেছেন।

দেশের আইন বা বিচার নিয়ে বিষয়ে উনার লেখা সচরাচর অনেক তথ্য সমৃদ্ধ হয় তাতে সন্দেহ নেই। তবে পাপিয়া ইস্যুতে উনারা কেন এক অস্থির হলেন তা ঠিক পরিষ্কার নয়। উনারা পাপিয়ার সেবা নিতেন, কিংবা পাপিয়াকে ব্যবহার করে ব্যবসা নিতেন তেমন কথা ভাবা মনে হয় উচিৎ হবে না। উনাদের কষ্ট বা জ্বলুনি অন্য খানে সেটাই ভাবতে চাই। ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ’ কথাটি সংকটে শিরোনামে তাঁর লেখায় উনি বলেছেন, ‘আসলে বিশেষ পরিস্থিতি বা কোনও ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি ছাড়া, বিশেষ করে সাধারণ ফৌজদারি অপরাধ দমনে ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ’ কথাটির ব্যবহার অপ্রয়োজনীয়।‘

এবার দেখি প্রধানমন্ত্রীকে কেন আদেশ দিতে হয়? উনি বলেছেন, ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সে ২৫টি ক্রমিকে শতাধিক ভিআইপি পদের মর্যাদাক্রম দেওয়া আছে। এর মধ্যে একজন পাপিয়া গ্রেপ্তারে রাষ্ট্রের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তির নির্দেশ কথাটির ব্যবহার তাই যথাযথ নয়। বরং ক্যাসিনো-সম্রাট ও সম্রাজ্ঞী পাপিয়ার পরে এটা আমরা শুনতে চাই যে এ ধরনের যাঁরা দলে আছেন, অবিলম্বে তাঁদের তালিকা তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সে এর বাংলা অনেকগুলো অর্থ আছে। যেমন-উচ্চপদের আভিজাত্য, গরিমা, অবস্থা, হাল, অবস্থান, ঠাটবাট, সামাজিক মর্যাদা, ইত্যাদি। এটা কিন্তু তাঁদের ক্ষমতা নির্দেশ করে না। ক্ষমতার আভিধানিক অর্থ হল শক্তি, সামর্থ্য; যোগ্যতা, পটুতা; প্রভাব, আধিপত্য, ইত্যাদি (রাজকীয় ক্ষমতা, রাজনৈতিক ক্ষমতা, প্রশাসনিক ক্ষমতা)।

ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সে এ ৫ নং এ আছে মন্ত্রীর নাম। প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী, এমপি’র কথা বাদই দিলাম। এবার দেখুন মন্ত্রীর ক্ষমতা কতটুকু। বাংলায় অনুবাদ করে দেখা যায় যে, RULES OF BUSINESS 1998 (Revised up to 2012) এর Chapter I, Rule no. 4 (iv) ধারা বলে মন্ত্রী জাতীয় সংসদে তাঁর মন্ত্রণালয়য়ের কাজের জন্য সংসদের কাছে দায়ী থাকবেন………। কিন্তু Rule no. 4 (v) তে বলা হয়েছে যে, একজন সচিব তাঁর মন্ত্রণায়ের প্রশাসনিক প্রধান ও একাউন্টিং চীফ। তিনি তাঁর মন্ত্রণালয়য়ের অধীনস্থ সকল দপ্তরের এ সব আইন মানা হচ্ছে কি না তা সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণ করবেন এবং মন্ত্রীকে মন্ত্রণালয়য়ের কাজ সম্পর্কে অবহিত করবেন। মানে দাঁড়ালো এই যে, প্রধানমন্ত্রী ছাড়া কোন মন্ত্রীর আদেশ শুনতে বা মানতে কোন সচিব বা তাঁর অধীনস্থ দপ্তরের কেউ বাধ্য না। এর একটা প্রমাণ খান সাহেবদের পত্রিকা থেকেই দেওয়া যেতে পারে।

২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ তারিখে প্রথম আলোর খবর ছিল “চট্টগ্রাম জেলা ভূমি অধিগ্রহণ কার্যালয়ের (এলে) শাখায় ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ রোববার দুপুরে আকস্মিক পরিদর্শনে যান (বর্তমান ভূমি মন্ত্রী) তৎকালীন ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী। সেখানে কয়েকজন সেবাগ্রহীতা তাঁর কাছে কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ করেন। মন্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে কয়েকটি অভিযোগ যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত নেন। অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় কার্যালয়ের তিন কর্মচারীকে তাৎক্ষণিক বদলির নির্দেশ দেন তিনি।

এই ঘটনার কিছুদিন পরে আবার একই অফিসে যাবার পরে সাইফুজ্জামান চৌধুরী দেখেন যে, দুর্নীতিবাজেরা বহাল তবিয়তে সেখানে কাজ করছে। তিনি তখন সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি আহমদ করিমকে কয়েক দিন আগে বদলি করার নির্দেশ দিয়েছিলাম। সেটা এখনো কার্যকর হয়নি’।

এর বাইরেও ক্ষমতার যে সব ঘাটতি, ফাঁক ফোঁকর আছে তা কভার করার জন্য RULES OF BUSINESS 1998 (Revised up to 2012) এর Chapter I, Rule no. 4 (iiv) এ দেওয়া ক্ষমতা বলে পুরা ক্ষমতা সচিবদের হাতে পোক্ত করে নেওয়া হয়েছে ‘সচিবালয় নির্দেশমালা-২০১৪’ জারি করে। বাংলাদেশে বিদ্যমান আইনে প্রধানমন্ত্রী ছাড়া একজন মন্ত্রী একজন পিয়নের বিরুদ্ধেও কিছু করার আইনগত ক্ষমতা রাখেন না। সেটা জানার পরেও জনাব খান সাহেবের গুরু আর সাঙ্গপাঙ্গরা আইনের আংশিক উধ্রিতি দিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে বিতর্কিত করতে চান।

এখন একটা কথা আসতে পারে এই আইন পরিবর্তন করা হয় না কেন? ঠিক এই আইনের পরিবর্তন বা সংশোধন জরুরি। তবে ব্রিটিশ উপনিবেশ আমল থেকে চলে আসা শত বছরের পুরাতন এই আইন পরিবর্তন কী এতই সহজ। মূল আইনের ভাষাও সব ইংরেজি। এখন ইংরেজি জানা অনেক ব্যারিস্টার আমাদের দেশে আছেন। তাঁদের দিয়ে একটা দীর্ঘ মেয়াদি কমিটি বা কমিশন করে প্রশাসনের আমলা আর রাজনৈতিক অংশের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য ও জবাবদিহিতা আনতে হবে। কেননা একটা শক্তিশালী আমলাতন্ত্র যে কোন দেশের জন্য খুবই জরুরি। আবার জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণে নতুন নতুন আইন প্রণয়ন ও তাঁর বাস্তবায়নে রাজনীতিবিদগণের কোন বিকল্প নেই।

উন্নয়নশীল সব দেশেই দেখা গেছে যে, ‘উন্নয়ন আর দুর্নীতি দুই ভাই’য়ের মত পাশাপাশি চলে। একসময় দুর্নীতি পিছু পড়ে যায়। শেখ হাসিনা তাঁর সীমিত সামর্থ্যের মধ্য দিয়ে চার হাত পা দিয়ে দুর্নীতির সাথে যুদ্ধ করে দেশের উন্নয়নে অক্লান্ত পরিশ্রমের কারণে দেশ বিদেশ সুনাম অর্জন করেছেন। এটা নিয়েই খান সাহেবের গুরুদের সমস্যা। তাই জনমনে শেখ হাসিনার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করে তাঁকে আর দেশকে বিপদে ফেলে না জায়েজ ফায়দা নেয়ার নতুন ষড়যন্ত্র ছাড়া এটা আর নতুন কিছু নয় বলেই অনেকে মনে করছেন।

লেখক: সায়েদুল আরেফিন

কলামিস্ট, উন্নয়নকর্মী